বুধবার, ২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, বিকাল ৫:৪১

পানি বন্দি লাখ লাখ মানুষ।

ডেইলি ক্রাইম বার্তা ডেস্ক : সমুদ্রের পানিতে প্লাবিত হয় আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের ১৭টি গ্রাম। জোয়ারের পানির অবাধ আসা-যাওয়ায় তিন মাস ধরে ভাসমান জীবনযাপন করে আসছিলেন সেখানকার মানুষ। এবার সেখানে দেখা দিয়েছে নতুন বিপদ। অবিরাম বৃষ্টিপাত এবং অস্বাভাবিক জোয়ারের তাণ্ডবে পাশের ইউনিয়ন শ্রিউলার ২১টি গ্রামও ভেসে গেল। ভেসে গেছে শত শত ঘেরের মাছ, গৃহপালিত পশু এবং অনেক ঘরবাড়িও। সাতক্ষীরার মতো খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের বিস্তীর্ণ উপকূল এখন পানির নিচে। কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। সড়ক যোগাযোগসহ স্বাভাবিক জীবনযাপনে নেমে এসেছে মারাত্মক দুর্ভোগ। উপকূলীয় এলাকার নদনদীর পানি দু’কূল উপচে উঠেছে। এতে নতুন নতুন বাঁধ ভেঙে মাছ, ফসল ও মৌসুমি সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জোয়ারের তোড়ে বিধ্বস্ত হচ্ছে অনেক বাঁধ। নদীভাঙনও গতি পেয়েছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এ দুর্যোগ থেকে শিগগিরই মুক্তি পাচ্ছে না উপকূলের মানুষ। চলতি মাসজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি লেগে থাকতে পারে। জোয়ার স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এলেও অতিবৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকস্মিক বন্যায় উপকূলীয় এলাকার কয়েক লাখ মানুষের তীব্র হাহাকার শুরু হয়েছে। পূর্বপ্রস্তুতি তো ছিলই না, দুর্যোগ সৃষ্টির পরও পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ খাদ্য ও মাথা গোঁজার জায়গা নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছেন।
তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আতিকুল হক বলেন, উপকূলীয় জেলাগুলোতে এই বন্যা পরিস্থিতি একেবারেই আকস্মিক। ফলে আগে থেকে বড় ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ কার্যক্রমের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। রবিবার জরুরি ভিত্তিতে সাত জেলায় এক হাজার ১০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ত্রাণকাজে ব্যবহারের জন্য ১৪ লাখ টাকা ও ১০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ মজুদ রয়েছে। প্রয়োজনে আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে। এদিকে, উপকূলের এ পরিস্থিতিকে আকস্মিক বন্যা হিসেবে দেখছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রও। সংস্থার নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া জানান, দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-মধ্য উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। অতিবৃষ্টি অব্যাহত থাকলেও জোয়ার স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার পানি নেমে আসবে। মধ্যাঞ্চলে স্বাভাবিক বন্যা পরিস্থিতিও উন্নতির দিকে। বর্তমানে পদ্মা, আত্রাই, ধলেশ্বরী ও যমুনা নদীর চারটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। তবে ক্রমে পানি নিচের দিকে প্রবহমান।
অন্যদিকে, আবহাওয়াবিদ ড. মো. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, মৌসুমি বায়ু দেশের ওপর সক্রিয় থাকা এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় বিরাজ করছে। এর সঙ্গে স্বাভাবিকের চেয়ে এক থেকে দুই ফুট উচ্চতায় জোয়ার আসছে। এর সঙ্গে উপকূলজুড়ে প্রবল বৃষ্টিপাত। সব মিলিয়ে ওই অঞ্চলে নাকাল অবস্থা। এ পরিস্থিতি আরও দু-এক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। আগস্টের শুরু থেকেই উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, সোমবার ঢাকা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও ভারি বৃষ্টিরও সম্ভাবনা রয়েছে।
গতকাল রবিবার দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ডিমলায়, ১০০ মিলিমিটার। এ ছাড়া অন্য এলাকার মধ্যে ঢাকায় ২৩ মিলিমিটার, চট্টগ্রামে ৩৪, সন্দ্বীপে ৬৭, চাঁদপুরে ৭৬, কক্সবাজারে ৭৬, সাতক্ষীরায় ৪৮, পটুয়াখালীতে ৫৫ এবং ভোলায় ৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
বরিশাল : নদনদীর রেকর্ড ভাঙা জোয়ারের পানি নেমে যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের জনপদ থেকে। কোথাও কোথাও নেমেও গেছে। তবে ফসলের সর্বনাশা ক্ষতি করে গেছে এ পানি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গ্রীষ্ফ্মকালীন শাকসবজি, সদ্য রোপণ করা আমন ধানের চারা ও আমনের বীজতলা এবং পানের বরজ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশালের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আফতাব উদ্দিন বলেন, ‘সবেমাত্র পানি কমতে শুরু হয়েছে। ছয় দিন পর কিছুটা রোদের তাপও পড়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পেতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে। তবে প্রাথমিকভাবে এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে ৩০ ভাগ ফসলি জমি জোয়ারের পানিতে আক্রান্ত হয়েছে।’
কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, বিভাগের ছয় জেলায় এক লাখ ২৪ হাজার ৪০৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।